অবৈধ গ্যাসে ছিপি আঁটা মহাকঠিন

 

অবৈধ গ্যাসে ছিপি আঁটা মহাকঠিন

পাইপলাইনে সরবরাহকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সুলভ তো বটেই, বারবার সিলিন্ডারে গ্যাস ভর্তি করার ঝক্কি-ঝামেলাও নেই। তাই আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম পছন্দ পাইপলাইনের গ্যাসে। বিশেষ করে পাইপলাইনে আবাসিক গ্যাস সংযোগ না থাকলে সে বাড়ি ভাড়া প্রদানে অনেক বিড়ম্বনা পোহাতে হয় বাড়িওয়ালাকে, ভাড়ার সময় বাড়তি অর্থ ছাড় পর্যন্ত দিতে হয় ক্ষেত্রবিশেষে। এমনও দেখা গেছে, পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ না থাকায় মাসের পর মাস বাড়ি খালি পড়ে থাকছে। অন্যদিকে মজুদ-স্বল্পতার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরেই আবাসিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সরকারের এ নির্দেশ অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে। বৈধভাবে সংযোগ না পেয়ে অনেক গ্রাহকই অবৈধ পন্থায় গ্যাসের সংযোগ নিচ্ছেন। তাদের এ অনৈতিক কা-ে নেপথ্য মদদ রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনীতিকদের। এছাড়া গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরও যোগসাজশ রয়েছে। তাদের করা অবৈধ গ্যাস সংযোগের এলাকাভিত্তিক চক্র বা সিন্ডিকেট খুবই প্রভাবশালী ও দাপুটে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযান-দল অফিসে পৌঁছানোর আগেই তারা ফের সংযোগ দিয়ে ফেলেন। দেশব্যাপী এমন অবৈধ গ্যাস সংযোগের মচ্ছব চলছে। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রতি মাসে অন্তত পাঁচশ কোটি টাকার গ্যাস পুড়ছে অবৈধ সংযোগের কারণে। এ গ্যাস রক্ষায় 
অবৈধ সংযোগের মুখে ছিপি আঁটা মহাকঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদে দফায় দফায় হুংকার হুশিয়ারি এবং সময়ে সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চললেও অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধে এসব কার্যক্রম তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। কি পরিমাণ অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছেÑ এর সঠিক কোনো তথ্যাদি নেই গ্যাস বিতরণ কোম্পানি বা পেট্রোবাংলার কাছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে অবৈধ গ্যাস সংযোগের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয়শ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অবৈধ চুলা বা বার্নারের সংখ্যা প্রায় সোয়া তিন লাখ। বিতরণ কোম্পানিগুলো অবশ্য এও বলছে যে, এসব অবৈধ সংযোগের একটি বড় অংশ উচ্ছেদ করা হয়েছে। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর হিসাব সঠিক বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এসব হিসাব অনুমাননির্ভর। তিনি মনে করেন, দেশে এখন বৈধ আবাসিক সংযোগ যে পরিমাণ রয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি রয়েছে অবৈধ সংযোগ। ওই কর্মকর্তা এটাও বলেছেন বিভিন্ন সময়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোর নানা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীরা প্রতি মাসে অন্তত পাচঁশ কোটি টাকার গ্যাস পোড়াচ্ছেন। এমনিক বিদেশ থেকে আমদানিকৃত অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার মাধ্যমে। 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকার দফায় দফায় নতুন নতুন কমিটি গঠন, বৈঠক ও কঠোর হুশিয়ারি দিলেও বাস্তবে অবৈধ গ্যাসের সংযোগ কমছে না। একদিকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে অন্যদিকে নতুন সংযোগ হয়ে যাচ্ছে; বরং সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের বিভিন্ন সময়ের কঠোর হুশিয়ারিকে পুঁজি করে গ্যাস কোম্পানির এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজরা ফায়দা লুটে নিচ্ছে। তাদের অধিকাংশই জোনাল অফিসে কর্মরত এবং বিস্ময়কর হলেও সত্যি, এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী সাধারণত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ দল বা পরিদর্শন দলের সদস্য। 
গত কয়েকদিন নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ, গাজীপুর, নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যেসব বড় বড় ভবনে অবৈধভাবে আবাসিক গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে তারা কোনো না কোনোভাবে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেই করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এক গ্রাহক যিনি ছয় তলা ভবন মালিক বলেন, বছরভিত্তিক চুক্তিতে গ্যাস ব্যবহার করছেন তিনি। প্রতি বছর তিতাসের একজন স্থানীয় নেতাকে এক লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে গ্যাস ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, শুধু আমি না এমন অনেকেই আছেন যারা বছরওয়ারি টাকা দিয়ে গ্যাস ব্যবহার করছেন।
সরকার অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ কোনোভাবেই এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। অবৈধ গ্যাস সংযোগ অপসারণ করতে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদর দিয়ে কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এসব কমিটিতে আছেন দুই জন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের চারজন উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে যুক্ত করা হয়েছে অভিযান কার্যক্রমে। সম্প্রতি জ¦ালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (অপারেশন) মোঃ আবুল মনসুরের সভাপতিত্বে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ ও পাইপলাইন অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত কমিটি বৈঠক হয়। সেখানে অবৈধ গ্যাস সংযোগের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে আলোচনা করা হয়। বৈঠকের তথ্য মতে জানা যায়, এ পর্যন্ত ৬টি বিতরণ কোম্পানি প্রায় সাড়ে ৬ শ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সংযোগ চিহ্নিত করেছে। এ ছাড়া চুলার বা বার্নার সংখ্যা চিহ্নিত করেছে প্রায় সোয়া তিন। এসব অবৈধ গ্যাসের কিছু অংশ উচ্ছেদ করতে পেরেছে কোম্পানিগুলো। 
অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদের অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদ করতে দিয়ে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা ঠিকমতো বৈধ বা অবৈধ নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে পারছে না। কারণ গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছেই নেই সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক ম্যাপ। ওই কর্মকর্তা বলেন এছাড়া অনেক জায়গায় গিয়ে দেখেছি সরকারি কোয়ার্টার, সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর লোকজনের আবাসন স্থলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। কোথাও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। কোথাও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে করা যায়নি।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদ করতে গিয়ে কোথাও কোথাও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে উচ্ছেদ টিমকে। গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপগঞ্জের তাজমহল রোড এলাকায় অভিযান করতে গেলে স্থানীয় জনগণের বাধার মুখে পড়ে অভিযানকারী টিম। জনগণ মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোক জমায়েত করে। পরে নির্বাহী অফিসার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উচ্ছেদ অভিযানের দায়িত্ব দিয়ে স্থান ত্যাগ করে চলে আসে। 
এ দিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিতাস গ্যাসের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত ১০ বছরে যে পরিমাণ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বা বৈধতার সুযোগ না থাকায় অনুমোদিত গ্যাস সংযোগ থাকা সত্ত্বেও অবৈধ চুলা বা বার্নারের সংখ্যা বেড়েছে সেটা অবৈধ সংযোগের কয়েকগুণ বেশি। তিনি বলেন, ২০১০ সালের পর থেকে যত নতুন ভবন হয়েছে বা ভবনের বর্ধিত অংশে গ্যাস ব্যবহার বেড়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো অবৈধ।

এদিকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ আরও কার্যকর করতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের উচ্ছেদ অভিযানে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব শফিউল আজিম বলেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের উচ্ছেদ অভিযানে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাওয়ার ব্যবস্থা করার পরও যদি কেউ না যায় তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈঠকে তিনি বলেন, বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি এবং তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন এলাকায় অবৈধ পাইপলাইন থাকতে পারে। তবে অবৈধ গ্রাহক তৈরি করেছে বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা কর্মচারীরাই। তিনি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেন সভায় জানান। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় তিতাসের কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি দল গিয়েছে অনুসন্ধানের কাজে। নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের তিতাসের ডিজিএম মোঃ মমিনুল হক আমাদের সময়কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিষয়ে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মোঃ নুরুল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার। সামনের দিনগুলোতে আরও জোরালো অভিযান চালানো হবে।
এদিকে মন্ত্রণালয় সম্প্রতি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অনুমোদন ছাড়া বাণিজ্যিক বা শিল্প শ্রেণির গ্যাস ব্যবহার করছে কিনা সেই বিষয়ে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি করবে; বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বাধার সম্মুুখীন হলে দন্ডবিধির ৩৫৩ ধারা অনুযায়ী মামলা দেওয়া হবে; পুলিশের সহায়তা নিয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে; গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে অভিযান কার্যক্রম পরিচালনা করবে; গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কোনো কর্মকর্তা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে মন্ত্রণালয় শুধু এবারই এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ২০১৫ সালের পর থেকে এমন উদ্যোগ কয়েক দফা নিয়েছে। 
এ দিকে গ্যাসের সংযোগ বন্ধ থাকার পরও তিতাস বিভিন্ন সময় গ্রাহকদের আবাসিক গ্যাস সংযোগ দিয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ এপ্রিল থেকে সারা দেশে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেয় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে ২০১৩ সালের শেষ দিকে সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর জ্বালানি বিভাগ থেকে মৌখিকভাবে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ না দিতে বলা হয়। এরপরও বিভিন্ন সময় তিতাস গ্যাস সংযোগ দিয়েছে। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে তিতাসের বোর্ড সভা সাত লাখ গ্রাহককে বৈধ করেছিল। সর্বশেষ গত বছরের ২০১৯ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে তিতাসসহ সব কয়েকটি গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানকে আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং সিএনজির নতুন সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় জ্বালানি বিভাগ।
আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখা এবং অবৈধ গ্যাস সংযোগ অব্যাহতভাবে বাড়ার বিষয়ে কনজুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেছেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর লাগামাহীন দুর্নীতির কথা অনেক দিন ধরেই আমরা বলে আসছি। তিনি বলেন, সংযোগ বন্ধ না চালু সেটা কোন ব্যাপার না। এদের ঘুষ দিলে সবই হয়ে যায়। তিনি বলেন, অতীতেও আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ ছিল। কিন্তু লাখ লাখ টাক ঘুষ নিয়ে ঠিকই সংযোগ দিয়েছে। এছাড়া তিনি বলেন, এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ না করে , এলপিজির সহজলভ্যতা নিশ্চিত না করে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখাও একটি বিশেষ মহলের স্বার্থ হাসিল করা।

Post a Comment

Previous Post Next Post